বাংলাদেশ আজ একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ সময় ধরে ‘স্থিতিশীলতা’, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ এবং ‘জাতীয় ঐক্য’র নামে পরিচালিত কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নির্বাচন বা প্রশাসনিক সংস্কার নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হলো একটি গভীরভাবে বৈচিত্র্যময় সমাজে গণতান্ত্রিক বৈধতা পুনর্গঠন করা।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের মূল কারণ হলো একরৈখিক (মনোকালচার) সমাজব্যবস্থা, যেখানে একটি নির্দিষ্ট জাতীয় সংস্কৃতিকে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘আদর্শ’ ধরে নিয়ে অন্য সব সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ব্যক্তিগত, গৌণ বা সন্দেহজনক করে রাখা হয়। যদি গণতান্ত্রিক সংস্কার সফল হতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই বহুসংস্কৃতিবাদ দিয়ে পরিচালিত হতে হবে। আর সেই বহুসংস্কৃতিবাদকে শুধু পারস্পরিক সহনশীলতার ধারণা হিসাবে নয়, বরং স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিকত্বের কাঠামো হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।
বহুসংস্কৃতিবাদ আসলে কী
বাংলাদেশে বহুসংস্কৃতিবাদ প্রায়ই ভুলভাবে উপস্থাপিত হয় জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকি, বিচ্ছিন্নতাবাদ, কিংবা রাজনৈতিক আপস হিসাবে। এ বিষয়টা পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে যখন আমরা মাদ্রাসা-ব্যাকগ্রাউন্ডের জনগোষ্ঠী, কিংবা পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, কিংবা কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সমানাধিকারের দাবির প্রতি সংখ্যাগুরুর দৃষ্টিভঙ্গির দিকে লক্ষ্য করি। উইল কিমলিকা, চার্লস টেইলর, ভিখু পারেখ ও তারিক মোদুদের মতো চিন্তাবিদরা দেখিয়েছেন, বহুসংস্কৃতিবাদ আসলে গণতান্ত্রিক সংহতিরই শর্ত।
কিমলিকা আমাদের মনে করিয়ে দেন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংস্কৃতির বাইরে সম্ভব নয়। মানুষ অর্থবহ সিদ্ধান্ত নিতে পারে শুধু ভাষা, ইতিহাস ও সামাজিক অনুশীলনের ভেতর দিয়েই। রাষ্ট্র যখন একটি বিশেষ সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয় এবং অন্যগুলোকে প্রান্তিক করে, তখন সে নিরপেক্ষ থাকে না; বরং স্বাধীনতাকে অসমভাবে বণ্টন করে।
চার্লস টেইলরের যুক্তি আরও গভীর। তিনি বলেন, পরিচয় গঠিত হয় সংলাপের মাধ্যমে। কোনো গোষ্ঠীকে যদি ধারাবাহিকভাবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয় বা অদৃশ্য করে রাখা হয়, তবে সেটি শুধু সামাজিক নয়, নৈতিক ক্ষতিও বয়ে আনে। তাই শুধু আইনি সমতা বা ‘সমান মর্যাদা’ যথেষ্ট নয়; দরকার সমান স্বীকৃতি যেন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং সংখ্যালঘু পরিচয়গুলো জাতীয় বয়ানের ভেতর জায়গা পায়।
ভিখু পারেখ দেখান, সংস্কৃতি কোনো স্থির বা একরূপ সত্তা নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে দরকার আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ, যেখানে পার্থক্যগুলো মিলিত হয়ে একটি যৌথ জনসংস্কৃতি গড়ে তোলে। ঐক্য উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু নয়; এটি আলোচনার মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়।
তারিক মোদুদের অবদান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বহুসংস্কৃতিবাদ জাতীয় পরিচয়ের বিরোধী নয়। বরং এটি এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তা চায়, যেখানে মানুষ ‘একই রকম’ হয়ে নয়, নিজের মতো করেই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সংহতি এখানে একতরফা অভিযোজন নয়, বরং পারস্পরিক রূপান্তর।
বাংলাদেশের একরৈখিক সাংস্কৃতিক সমস্যা
বাংলাদেশ সমাজতাত্ত্বিকভাবে বহুসংস্কৃতির, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে একরৈখিক। নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ইসলামের ভেতরকার বৈচিত্র্য, আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও শ্রেণিভিত্তিক পরিচয়ের সবই এ সমাজের অংশ। অথচ রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে একটি সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদী কাঠামোর মাধ্যমে শাসন করেছে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট বাঙালি ধর্মনিরপেক্ষ-লিবারেটারিয়ান সংস্কৃতি জাতীয় মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে।
নীতিগতভাবে এ কাঠামো সবার সমানাধিকারের কথা বললে বাস্তবে এটি বৈষম্যমূলক। এ প্রগতিশীল-সেক্যুলার-চেতনাপন্থি পরিচয়কাঠামোর বাইরের আর সব পরিচয়কে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে হলে তাদের নীরব, ব্যক্তিগত এবং অরাজনৈতিক থাকতে হয়। নিজেদের অধিকারের কথা বলতে গেলে, নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রকাশ্যে ধারণ করতে গেলে সেটাকে সঙ্গে সঙ্গে দেশবিরোধী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এমন পরিপ্রেক্ষিতে এসব জনগোষ্ঠীর জন্য সংহতির অর্থ দাঁড়ায় ডমিন্যান্ট প্রগতিশীল-সেক্যুলার-চেতনাপন্থি পরিচয়ের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এর অনিবার্য ফলাফল জাতীয় ঐক্য নয়, বরং বিচ্ছিন্নতা। এই ব্যর্থতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো মাদ্রাসা ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার বিভাজন।
মাদ্রাসা-ধর্মনিরপেক্ষ বিভাজন : স্বীকৃতির ব্যর্থতা
দীর্ঘদিন ধরে মাদ্রাসা শিক্ষাকে রাষ্ট্র ও এলিট আলোচনায় উপস্থাপন করা হয়েছে একটি সমস্যা হিসাবে-পশ্চাৎপদ, আধুনিকতার বিরোধী, এমনকি সামাজিক ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসাবে। ফলে সংস্কারের নামে দেখা গেছে, নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ এবং ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া একমুখী নীতিমালা।
এ দৃষ্টিভঙ্গি মূল সমস্যাটাই ধরতে ব্যর্থ।
বাংলাদেশের লাখ লাখ নাগরিক, বিশেষ করে দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবার, মাদ্রাসার মাধ্যমে শিক্ষা, নৈতিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক পরিচয় লাভ করে। যেখানে রাষ্ট্র মানসম্মত ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি, সেখানে মাদ্রাসা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর বিকল্প হয়েছে।
মাদ্রাসাকে অস্বীকার করে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাকে একমাত্র আধুনিক নাগরিকত্বের মানদণ্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা মানে হলো, একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক শ্রেণিবৈষম্য চাপিয়ে দেওয়া। চার্লস টেইলরের ভাষায়, এটি ‘misrecognition’ বা ভুল স্বীকৃতি। তারিক মোদুদের যুক্তিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন যে, স্বীকৃতি ছাড়া সংহতি সম্ভব নয়। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সমাজের মূলধারা থেকে দূরে থাকে এজন্য না যে, তারা সমাজকে প্রত্যাখ্যান করে; বরং মূলধারা সমাজই তাদের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিকে নানাবিধ শর্তের বেড়াজালে বেঁধে দিয়ে তাদের অংশগ্রহণকে কঠিন করে তোলে।
বহুসংস্কৃতিবাদী সংস্কার কেমন হতে পারে
বহুসংস্কৃতিবাদ মানে সব সংস্কৃতিকে নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া নয়। এটি মানে অন্তর্ভুক্তি, জবাবদিহি ও সংলাপের সমন্বিত সংস্কার।
প্রথমত, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে শিক্ষাগত বহুত্বকে স্বীকৃতি দিতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বৈধ অংশ, এ কথা নীতিগতভাবে মেনে নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সংস্কার হতে হবে সংলাপের মাধ্যমে, পুলিশি মানসিকতা দিয়ে নয়। পাঠ্যক্রম সংস্কারে মাদ্রাসা শিক্ষক, ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজকে যুক্ত করতে হবে। লক্ষ্য হবে নাগরিক শিক্ষা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও কর্মসংস্থানযোগ্যতা, সংস্কৃতি মুছে ফেলা নয়।
তৃতীয়ত, নাগরিকত্বে সমান স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, সরকারি চাকরি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে কাঠামোগত বাধা দূর করতে হবে।
সবশেষে, ধর্মনিরপেক্ষতাকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এটি যেন ধর্মীয় আধিপত্য ঠেকানোর বদলে ধর্মীয় নাগরিকদের বাদ দেওয়ার হাতিয়ার না হয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রশ্ন তুলতে হবে যে, এটি কি ন্যায়সংগত সহাবস্থান নিশ্চিত করছে?
উপসংহার : স্বীকৃতির মধ্য দিয়েই ঐক্য
বাংলাদেশের প্রয়োজন কম বৈচিত্র্য নয়, কিংবা আরও বেশি একক সাংস্কৃতিক শাসন নয়। প্রয়োজন একটি নতুন গণতান্ত্রিক চুক্তি, যেখানে সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে সমস্যা নয়, বাস্তবতা হিসাবে গ্রহণ করা হবে।
বহুসংস্কৃতিবাদ বিভাজনের রাজনীতি নয়। এটি হলো এমন একটি পথ, যেখানে ঐক্য গড়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে; পারস্পরিক স্বীকৃতি, উন্মুক্ত সংলাপ ও যৌথ নাগরিকত্বের মাধ্যমে।
সংস্কার যদি সত্যিই সফল করতে হয়, তাহলে বাংলাদেশকে একমুখী বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছাড়িয়ে যেতে হবে এবং গড়ে তুলতে হবে এমন এক নাগরিক কল্পনা, যেখানে অন্তর্ভুক্তি কোনো সাংস্কৃতিক শর্তের ওপর নির্ভরশীল নয়, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বাঙালি, অবাঙালি, সমতলবাসী, পাহাড়ি সবাই নিঃসংকোচে, বিনা শর্তে অংশ নিতে পারবে।
এইটাই টেকসই ভবিষ্যতের গঠনে বাংলাদেশের জন্য একমাত্র পথ।
ড. হাসান মাহমুদ : সহযোগী অধ্যাপক, নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কাতার
১ই ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, তারিখে দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত।

