ভুমিকা:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে যেই আলোচনাটা সবচেয়ে বেশি শুনা যায় সেটি হলোঃ
১) বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্র একটি।
এবং যেটার কারণে আরো একটি দ্বিতীয় সমস্যা তৈরি হয়, সেটি হলোঃ
২) বাংলাদেশে একটা উইনার-টেইকস-অল কালচার।
এই উইনার-টেইকস-অল কালচার নিয়ে প্রচুর লেখালেখিও আছে। এমনকি একাডেমিয়াতেও আছে। এই উইনার-টেইকস-অল কালচারই স্বৈরশাসন ও ফ্যাসিস্টিক কালচার তৈরি করে। সুতরাং রাষ্ট্র সংস্কার করা বা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে একটা সাস্টেইনেবল ডেমোক্রেটিক প্রাকটিসের মধ্যে নেয়ার জন্য রাষ্ট্রের এই পাওয়ার এককেন্দ্রিকতা বের হওয়ার কোন বিকল্প নাই। আমাদের এমন একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো দাড় করাতে হবে যেখানে রাষ্ট্রের পাওয়ার বা ক্ষমতা একাধিক জায়গায় থাকবে।
সেই লক্ষ্যে আমাদের মোটাদাগে কয়েকটি প্রস্তাবনা আছে।
প্রস্তাবনা:
রাষ্ট্রে কমপক্ষে তিনটি স্বতন্ত্র ভাবে নির্বাচিত পাব্লিক বডি বা কমিশন বা কাউন্সিল থাকতে হবে। যেই ৩টি হবে রাষ্ট্রের আলাদা তিনটি পাওয়ার সেন্টার, সরকারের থেকে তারা স্বতন্ত্রভাবে ফাংশন করবে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রি ও প্রেসিডেন্টের মাঝেও ক্ষমতার ভাগাভাগি হতে পারে ।
প্রথমত: মিডিয়ায় গণতন্ত্রায়নের জন্য পাবলিক মিডিয়া বডি নির্বাচিত হবে নাম হতে পারে সুপ্রীম মিডিয়া কাউন্সিল/কাউন্সিল। এই বডির মূল কাজ হবে দেশের ক্ষমতায় থাকা সরকার বিরোধী ভিন্নমতকে সর্বাচ্চ প্রমোট করার মাধ্যমে দেশের মিডিয়ায় গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করা।
(মিডিয়ার কথা প্রথম উল্লেখ করার প্রধান কারণ হলো, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মিডিয়ার গণতন্ত্রায়ন ছাড়া সমাজের ও রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়ন একেবারেই সম্ভব নয়)
দ্বিতীয়ত, একইরকম ভাবে সুপ্রিম কোর্ট পরিচালনার জন্য আরেকটি আলাদা নির্বাচিত বডি থাকবে, নাম হতে পারে সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। এই জুডিশিয়াল কাউন্সিলই বিচারপতি নিয়োগ দেয়া থেকে শুরু করে দেশের বিচারবিভাগ দেখভাল করবে।
তৃতীয়ত, আরো একটি থাকবে নির্বাচন কমিশনের জন্য, সুপ্রীম ইলেকশন কাউন্সিল। এই কাউন্সিলই নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিবে।
চতুর্থত, প্রেসিডেন্টেকে সরাসরি ভোটে ৫-৬ বছরের জন্য নির্বাচিত করা, যাতে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ভিন্নতা থাকার সুযোগ থাকে। এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রে প্রধান থাকবেন আগের মতই তবে, পূর্বের নমিনাল রোল থেকে মুক্ত হয়ে রাষ্ট্রের সুপ্রিম তিনটি কাউন্সিলের অভিভাবক থাকবেন ভেটো পাওয়ার সহ। আগের মতই প্রধানমন্ত্রি রাষ্ট্রের চীফ এক্সিকিউটিভ থাকবেন ।
উল্লেখিত তিনটি বডিই নির্বাচিত করবে একটি পার্লামেন্ট, যেটিকে আমেরিকার আদলে সিনেট বলা যেতে পারে । এটিকে পাশ করবেন প্রেসিডেন্ট এবং এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ভেটো পাওয়ার থাকবে। এবং প্রত্যেকটি নির্বাচনই – সেটা সুপ্রিম বডিরই হোক অথবা সুপ্রিম বডি যাদের নির্বাচন করবে সেটারই হোক- হবে স্ট্যাগার্ড ম্যানারে। মানে হলো একবারে একই বডির সব সদস্য নির্বাচিত হবেনা, আবারে একবারে একসাথে রিটায়ার করবেনা। এই সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে একটি অথোরিটিতে সবপক্ষের প্রতিনিধি থাকার সম্ভাবনা সর্বোচ্চ হয়।
নির্বাচন ব্যবস্থা:
- দেশের নির্বাচনগুলো হবে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট এবং হাউজ নির্বাচনের মত করে।
- প্রতি তিন থেকে চার বছর পর পর প্রতি জেলা থেকে দুইজন করে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হতে পারে
- যদিও হাউসের সদস্যদের সংখ্যা (এমপি) জনসংখ্যার ভিত্তিতে হতে পারে, ১৫০ টি আসনের বেশি হওয়া উচিত নয়
- সিনেট সুপ্রীম মিডিয়া কাউন্সিল, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এবং সুপ্রিম ইলেকশন কাউন্সিল নির্বাচন করবে।
- এই সুপ্রীম কাউন্সিলগুলো তৈরীতে আলাদা আলাদা সিনেট কর্তৃক সর্বদলীয় জাতীয় কমিটি হবে এবং সেই কমিটির প্রস্তাবনানুসারে সিনেটে নামগুলো পাশ হবে আলাদা আলাদা মেয়াদের জন্য এবং পাঠানো হবে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের জন্য। কেউ ৩ বছর, কেউবা ২ বছর অথবা কেউ ৪ বছরের জন্য । যাতে একই সিনেটের হাতে যেকোন কাউন্সিলের সকলকে নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা না থাকে।
- সিনেট ও পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ, এই দুটি বডিরই (যেটাকে একত্রে আমেরিকার কংগ্রেস বলা যেতে পারে) দুই তৃতীয়াংশের মতের ভিত্তিতে নিয়োগকৃত কোন কাউন্সিল সদস্যকে পদচ্যুত বা অপসারন করার প্রস্তাব পাঠাতে পারবে প্রেসিডেন্টকে, এক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্টের ভেটো পাওয়ার থাকবে।
এরকম স্বতন্ত্রভাবে তিন ভিন্ন বডি ও রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু ক্ষমতা থাকলে দলীয় সরকারের জন্য হস্তক্ষেপ কঠিন হবে এবং এরকম কোন চেষ্টা যদি থাকেও, একটি গণতান্ত্রিক মিডিয়া সেটি অনেকাংশে প্রতিরোধ করতে পারবে। এই গুলোকে আরো ফুলপ্রুফ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মত করে কংগ্রেশনাল (সিনেট ও হাউজ) সিস্টেম করে সরকারের ক্ষমতাকে ভাগাভাগি করতে হবে। তাহলে একনায়ক হয়ে উঠা খুবই কঠিন হবে।
পরিশেষে, আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে সংবিধানের কিছু তত্ত্বগত চেইঞ্জ করার সাথে সাথেই মানুষের বা আওয়ামী লীগের বা বাংলাদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর চরিত্র ও কালচারাল রাতারাতি চেইঞ্জ হবে না, হয় না। এগুলো সবই তত্ত্ব। আমাদের কে বেশি ফোকাস করতে হবে কর্মসূচির দিকে, তত্ত্বের দিকে না ।
উল্লেখ্য, কমিশন এই ব্রোডার প্রস্তাবনাগুলোতে আগ্রহ প্রকাশ করলে প্রস্তাবনা নিয়ে আরো বিস্তারিত নীতিমালা তৈরী করা যেতে পারে।
তারিখ: ১৫/১১/২৪