কয়েক দশক ধরে, আরো নির্দিষ্ট করে বললে ষাটের দশক থেকে আমেরিকার শ্রমবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সারা বিশ্বের চাকরিপ্রত্যাশী এবং উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ ও উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে আমেরিকায় যায়। তবে যাদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয়, তাদের তুলনায় আরো অনেক বেশি মানুষ সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করে। নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আগ্রহী হওয়ায় দেশটি বিভিন্ন ধরনের ভিসা ইস্যু করে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো স্টুডেন্ট-ভিসা (F1), ভ্রমণভিসা (B1/B2) এবং চাকরিভিত্তিক ভিসা (বিশেষত H1B)। H1B ভিসা হলো এমন একটি কর্মভিসা, যার মাধ্যমে মার্কিন কোম্পানি এবং প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ বিদেশী এমপ্লয়ি নিয়োগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার সম্প্রতি এ ভিসার ওপর নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার নয়, বৈশ্বিক শ্রমবাজার এবং উচ্চশিক্ষার গন্তব্যেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিভা আহরণ (ট্যালেন্ট হান্ট) ও ট্যালেন্ট ধরে রাখার স্ট্র্যাটেজিকে প্রভাবিত করবে। পাশাপাশি ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো অঞ্চলগুলো এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাপী দক্ষ জনশক্তি আকর্ষণে এগিয়ে আসবে ও সফল হবে। ফলে পরিবর্তিত হবে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের মানচিত্র ও উচ্চশিক্ষার গন্তব্যও।
H1B ভিসা ও ইস্যু প্রক্রিয়া
H1B ভিসা হলো একটি অস্থায়ী নন-ইমিগ্রান্ট কর্মভিসা, অর্থাৎ এটি স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি নয়। প্রাথমিকভাবে ভিসার মেয়াদ তিন বছর, তবে প্রয়োজন অনুসারে আরো তিন বছর বাড়ানো যায়। আর এ ভিসাধারীরা গ্রিন কার্ডধারীদের মতো স্থায়ী হিসেবে বিবেচিত হয় না বলেই নন-ইমিগ্রান্ট বলা হয়। এ ভিসার জন্য আবেদন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—যেমন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কিংবা কোম্পানি। উদাহরণস্বরূপ গুগল, অ্যামাজন, মেটা এবং আরো অসংখ্য বড় ও ছোট প্রতিষ্ঠান বিদেশী দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জমা দেয়। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার H1B ভিসার প্রায় চার লাখ আবেদন অনুমোদন করেছে (লটারির মাধ্যমে)। অনুমোদিত প্রার্থীরা তিন বছরের ভিসা পায় এবং পরবর্তী সময়ে কোম্পানি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতিতে এটি আরো তিন বছরের জন্য বাড়ানো যায়। আবেদনের ফি প্রার্থী নয়, বরং সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান বহন করে থাকে। আগে এ ফি ছিল ২-৫ হাজার ডলারের মধ্যে। কিন্তু নতুন নিয়মে আবেদন ফি হবে ১ লাখ ডলার। সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন মানদণ্ড—‘হাই স্যালারি, হাই স্কিল’ (উচ্চ বেতন-উচ্চ দক্ষতা)। অর্থাৎ যেসব প্রার্থী উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন এবং যাদের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ বেতন নির্ধারণ করবে, কেবল তারাই অগ্রাধিকার পাবে। এ প্রক্রিয়ায় আর লটারির প্রয়োজন হবে না; বরং যোগ্যতা আর উচ্চ বেতনের ভিত্তিতে আবেদনকারীরা ভিসা পাবে।
কী প্রভাব পড়বে
নতুন নিয়ম বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে। এ প্রভাব শুধু আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; উন্নত ও অনুন্নত দেশের শ্রমবাজারেও এর প্রতিধ্বনি শোনা যাবে। উল্লেখ করা দরকার, এ নতুন নিয়ম বর্তমান সরকারের বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ। যার লক্ষ্য আমেরিকার শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেয়া। উচ্চ ফি এবং কঠোর শর্তের কারণে অনেক মার্কিন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান আর সহজে বিদেশী কর্মী নিয়োগে আগ্রহী হবে না। এতে যেসব বিদেশী চাকরিপ্রত্যাশী সরাসরি নিজ দেশ থেকে বা উচ্চশিক্ষা শেষ করে আমেরিকার চাকরির বাজারে যেত তাদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা কমবে। এমনকি যারা চাকরি পাবে দীর্ঘমেয়াদে তাদের ধরে রাখার সামর্থ্য অনেক প্রতিষ্ঠানের থাকবে না। এতে আমেরিকানদের কর্মসংস্থান তৈরি হবে ঠিকই কিন্তু সারা বিশ্ব থেকে যে আমেরিকাতে মেধাবীরা চাকরি এবং পড়ালেখা করতে আসত তাদের আসার হার কমবে। দীর্ঘ সময় এ ধারা চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেন’ ঘটতে পারে। ফলে গবেষণা কমবে, উদ্ভাবন ব্যাহত হবে, অর্থনীতি দুর্বল হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন রাজনৈতিক প্রভাবও হ্রাস পাবে। তাই নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প নীতি ও কৌশল গ্রহণ করবে, যাতে দেশীয় কর্মসংস্থান রক্ষা করার পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রতিভাও ধরে রাখাতে পারে। কিন্তু সেই স্ট্র্যাটেজি কেমন হবে তা এখন স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশের করণীয়
H1B-এর জন্য যতজন আবেদন করে এবং যতগুলো আবেদন অ্যাপ্রুভ হয় তাদের ৭০ ভাগ ভারতীয় নাগরিক। দ্বিতীয় স্থানে আছে চীন। ২০২৪ সালে, ১১৭৩ জন বাংলাদেশীর H1B আবেদন অ্যাপ্রুভ হয়। ইউএস এম্বেসি বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী আমেরিকায় শিক্ষার্থী প্রেরণে বাংলাদেশ অষ্টমতম। তার মানে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী আমেরিকায় যায় পড়ালেখা করতে এবং তাদের একটি বড় অংশ পড়াশোনা শেষ করে আমেরিকাতেই চাকরির আবেদন করে। কেউ কেউ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে, আবার কেউ বিয়ের মাধ্যমে গ্রিন কার্ড পাওয়ার চেষ্টা করে।
এখন নতুন নিয়ম H1B ভিসা পাওয়া এবং ভিসা পেয়ে পরবর্তী সময়ে গ্রিন কার্ড পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে ইউরোপ বা অন্যান্য দেশে পড়াশোনা ও চাকরির সুযোগ খুঁজবে। অনেকেই চীন, মালয়েশিয়া বা এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে থেকেই ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করবে। তবে এটিও সত্য যে কম্পিউটার সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং, ফাইন্যান্স, অ্যাকাউন্টিং, বিজনেস অ্যানালিটিকস ও ডাটা সায়েন্সের মতো ক্ষেত্রগুলোয় বৈশ্বিক শ্রমবাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এসব বিষয়ে দক্ষ প্রার্থীদের জন্য বড় বড় মার্কিন কোম্পানি উচ্চ ফি দিয়েও ভিসা স্পন্সর করতে আগ্রহী হবে। ফলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যদি এ ধরনের উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করে, তবে তাদের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালগুলোকে আধুনিক এবং যে সাবজেক্টের সারা বিশ্বে ডিমান্ড বেশি সেগুলোর ওপর ডিগ্রি দিতে হবে।
অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে অনেক কাজ এখন কম খরচে অন্য দেশে আউটসোর্স করা যায়। ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশীদের জন্য শ্রমবাজার ও স্থায়ী হওয়ার সুযোগ আরো সীমিত হয়ে আসবে। তাই বাংলাদেশে থেকে কীভাবে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়া যায় সেজন্য প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপে স্ট্র্যাটেজি প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের কেবল আমেরিকার শ্রমবাজারের ওপর নির্ভর না থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চাকরির বাজারের দিকেও কৌশলগত নজর দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও দক্ষ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
ড. মো. ফরিদ তালুকদার: অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ম্যাকনিস স্টেট ইউনিভার্সিটি, লুইজিয়ানা, যুক্তরাষ্ট্র


