
ফাইল ছবি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার একটি প্রধান উৎস নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির রক্তস্রোত, দারিদ্র্য হ্রাসের একটি কার্যকর হাতিয়ার এবং অসংখ্য পরিবারের জীবিকা নির্বাহের ভিত্তি। কিন্তু এ গুরুত্বপূর্ণ অর্থপ্রবাহকে আমরা এখনো অনেকাংশে একটি সরলীকৃত ধারণার মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছি-যে ধারণা বলে, যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বিদেশে থাকে, তারাই বেশি রেমিট্যান্স পাঠায়; আর যারা পরিবারসহ বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে, তারা ধীরে ধীরে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং রেমিট্যান্স কমিয়ে দেয়।
এ ধারণাটি আংশিক সত্য হলেও বাস্তবতার পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয় না। বরং এটি আমাদের দৃষ্টি আড়াল করে একটি গভীরতর বাস্তবতা থেকে-যে বাস্তবতায় দেখা যায়, পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে (উদাহরণ হিসেবে) স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি অভিবাসীরাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এবং নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? যদি তাদের পরিবার আর বাংলাদেশে না থাকে, তাহলে কি তাদের রেমিট্যান্স পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করে?
প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার বাইরে যেতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্সকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ‘New economics of labor migration’ বা NELM তত্ত্বের মাধ্যমে; যেখানে অভিবাসনকে একটি পারিবারিক বিনিয়োগ হিসাবে দেখা হয় এবং রেমিট্যান্সকে সেই বিনিয়োগের প্রতিদান হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এ ব্যাখ্যা বাস্তব অভিজ্ঞতার অনেক দিককে উপেক্ষা করে।
এ তত্ত্ব পরিবারকে একটি একক ও ঐক্যবদ্ধ সত্তা হিসাবে ধরে নেয়, যেখানে দ্বন্দ্ব নেই, সম্পর্কের পরিবর্তন নেই এবং আবেগের কোনো স্থান নেই। অথচ বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং সম্পর্কের পরিবর্তনকে উপেক্ষা করলে রেমিট্যান্সের প্রকৃত কারণ বোঝা যায় না।
‘Belonging’ : রেমিট্যান্স বোঝার মূল চাবিকাঠি
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জীবনে রেমিট্যান্স কোনো ‘চুক্তিভিত্তিক লেনদেন’ নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব, একটি সাংস্কৃতিক চর্চা এবং একটি সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যম। তারা রেমিট্যান্স পাঠান, কারণ তারা এখনো নিজেদের সেই পরিবারের অংশ হিসাবে দেখেন, যেখান থেকে তারা এসেছেন।
এ অনুভূতিকে বোঝার জন্য ‘belonging’ বা অন্তর্ভুক্তির ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার পিএইচডি গবেষণাগ্রন্থ Remittance as belonging: global migration, Transnationalism, and the quest for home-এ অন্তর্ভুক্তির ধারণাটিকে কেন্দ্রীয় বিশ্লেষণাত্মক ফ্রেমওয়ার্ক হিসাবে নিয়ে বাংলাদেশি অভিবাসীদের রেমিট্যান্সকে বিশ্লেষণ করেছি। এ গবেষণার আলোকেই আমি ব্যাখ্যা করছি স্থায়ী অভিবাসীরা কী কী আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হয়।
অভিবাসীদের জন্য ‘বাড়ি’ শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি একটি অভিজ্ঞতা, একটি সম্পর্কের জাল, একটি স্মৃতি এবং একটি পরিচয়ের উৎস। একজন অভিবাসী একই সঙ্গে একাধিক জায়গায় ‘অন্তর্ভুক্ত’ থাকতে পারে-যুক্তরাষ্ট্রে তার বর্তমান জীবন এবং বাংলাদেশে তার শিকড়।
নৈতিক অর্থনীতি ও পারিবারিক দায়িত্ব
বাংলাদেশি অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এ অন্তর্ভুক্তি বহুমাত্রিক। তারা একসঙ্গে তাদের পিতামাতার পরিবার, নিজেদের নিউক্লিয়ার পরিবার, ভাইবোনদের নিয়ে গঠিত যৌথ পরিবার, সম্প্রসারিত আত্মীয়গোষ্ঠী এবং এমনকি পুরো গ্রাম বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে। ফলে রেমিট্যান্সও একরৈখিক নয়; এটি বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এবং বিভিন্ন অর্থবহ প্রেক্ষাপটে ঘটে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো-রেমিট্যান্স এখানে অর্থনৈতিক যুক্তির চেয়ে বেশি ‘নৈতিক অর্থনীতি’র অংশ। বাংলাদেশি সমাজে সন্তানদের, বিশেষ করে ছেলেদের, পরিবারের প্রতি আর্থিক দায়িত্ব পালন একটি গভীরভাবে প্রোথিত সামাজিক মূল্যবোধ। অভিবাসীরা এ মূল্যবোধ নিয়ে বিদেশে যায় এবং সেটিকে বজায় রাখে।
এ নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হয় কৃতজ্ঞতার অনুভূতি-পরিবারের বিনিয়োগের প্রতিদান হিসাবে রেমিট্যান্স পাঠানো।
পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন ও রেমিট্যান্সের রূপান্তর
তবে এ সম্পর্ক স্থির নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিবাসীদের জীবনে পরিবর্তন আসে-বিবাহ, সন্তান জন্ম, পেশাগত স্থিতি, নাগরিকত্ব লাভ-এসব পরিবর্তন তাদের অন্তর্ভুক্তির ধরনকে বদলে দেয়।
বিবাহের পর একজন অভিবাসীর দায়িত্বের কেন্দ্র পিতা-মাতার পরিবার থেকে সরে এসে নিজের নিউক্লিয়ার পরিবারের দিকে চলে যায়। ফলে পিতা-মাতার জন্য রেমিট্যান্স কিছুটা কমতে পারে, তবে সম্পূর্ণ বন্ধ হয় না।
একই সঙ্গে ভাইবোনদের সঙ্গে সম্পর্কেও পরিবর্তন আসে। তারা নিজেদের পরিবার গঠন করে, আলাদা অর্থনৈতিক সত্তায় পরিণত হয়। এর ফলে যৌথ পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
যৌথ বিনিয়োগ থেকে ব্যক্তিগত বিনিয়োগে রূপান্তর
প্রথমদিকে অনেক অভিবাসী পরিবারসহ যৌথভাবে বিনিয়োগ করে-জমি, কৃষি প্রকল্প, ব্যবসা ইত্যাদিতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ও সম্পর্কের পরিবর্তনের কারণে এ যৌথ বিনিয়োগ কমে যায়।
এর পরিবর্তে অভিবাসীরা নিজের নামে বিনিয়োগ করতে শুরু করে-ঢাকায় ফ্ল্যাট, জমি, ব্যাংক সঞ্চয় বা অন্যান্য আর্থিক খাতে। এ পরিবর্তনটি গবেষণায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
দেশে ফেরার কল্পনা ও নস্টালজিয়া
অভিবাসীদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক উপাদান হলো দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা। যদিও অনেকেই বাস্তবে আর ফিরে যায় না, তবুও তারা বিশ্বাস করে, একদিন ফিরে যাবে।
এই ‘ফিরতি অভিবাসন’ তাদের রেমিট্যান্স আচরণকে প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে শৈশব, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্পর্কের প্রতি নস্টালজিয়া তাদের বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত রাখে।
পরিবার থেকে সম্প্রদায় : রেমিট্যান্সের বিস্তার
রেমিট্যান্স শুধু পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সম্প্রদায়ের দিকেও বিস্তৃত হয়। অভিবাসীরা মসজিদে দান করে, শিক্ষার্থীদের সহায়তা করে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাহায্য পাঠায়।
এ ধরনের রেমিট্যান্স তাদের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, যা গবেষণায় বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
দ্বৈত অন্তর্ভুক্তি ও টানাপোড়েন
অভিবাসীরা একসঙ্গে দুই সমাজে অন্তর্ভুক্ত-যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ। কিন্তু এ দ্বৈত অন্তর্ভুক্তি সবসময় মসৃণ নয়।
পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত লক্ষ্য-এসবের মধ্যে সংঘর্ষ তৈরি হয়। এই অন্তর্ভুক্তি ও টানাপোড়েন কখনো রেমিট্যান্স কমিয়ে দেয়, আবার কখনো নতুনভাবে বাড়িয়ে তোলে।
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স নীতির সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স নীতির প্রধান ফোকাস অর্থনৈতিক প্রণোদনা-যেমন, ২.৫ শতাংশ নগদ বোনাস। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও রেমিট্যান্সের সামাজিক ভিত্তিকে স্পর্শ করে না। ফলে নীতিগুলো আংশিক কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
শক্তিশালী নীতিগত অবস্থান : ‘অন্তর্ভুক্তি’কেই কেন্দ্র করতে হবে
এ প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে : রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে শুধু অর্থনৈতিক প্রণোদনা নয়, অভিবাসীদের অন্তর্ভুক্তির অনুভূতিকে শক্তিশালী করতে হবে। এ যুক্তির ভিত্তিতে কয়েকটি নীতিগত দিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রথমত, স্থায়ী অভিবাসীদের আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী, তাই তাদের জন্য ডায়াসপোরা বন্ড, নিরাপদ বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এবং বিশেষ আর্থিক পণ্য তৈরি করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থা তৈরি করতে হবে। জমি রেজিস্ট্রেশন, সম্পত্তি সুরক্ষা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে অভিবাসীরা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবেন।
তৃতীয়ত, ডায়াসপোরা এনগেজমেন্টকে সাংস্কৃতিক স্তরে শক্তিশালী করতে হবে। প্রবাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, দ্বিতীয় প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা-এসব উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, কমিউনিটিভিত্তিক রেমিট্যান্সকে উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। সরকার ডায়াসপোরা ফান্ডের মাধ্যমে এ অর্থকে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করতে পারে।
পঞ্চমত, পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা দরকার।
রেমিট্যান্স বাড়ানোর নতুন পথ
সবশেষে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-রাষ্ট্রকে অভিবাসীদের শুধু ‘ডলার পাঠানো ব্যক্তি’ হিসাবে দেখা বন্ধ করতে হবে। তারা একটি জটিল সামাজিক সত্তা, যারা পরিবার, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
অতএব, আমাদের মূল যুক্তি স্পষ্ট
স্থায়ী অভিবাসীরাও রেমিট্যান্স পাঠান-কারণ তারা এখনো বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত। এ সংযোগ অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানসিক। তাই রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে এ সংযোগকে শক্তিশালী করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর নীতি।
ড. হাসান মাহমুদ : সহযোগী অধ্যাপক, নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কাতার
০৫ মে ২০২৬, দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত।