ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা কিংবা ছাত্র সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকা ছাত্রজীবনের সহশিক্ষা কার্যক্রমের (এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি) একটা অংশ মাত্র। কিন্তু বাংলাদেশে এ নির্বাচনকে ঘিরে যে মাত্রার সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা দেখা যায় তা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে বিকৃত এবং বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সঙ্গে বেমানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ে (ভালো মানের যেকোনো স্কুল-কলেজেও) ডিবেটিং ক্লাব, সাংস্কৃতিক ক্লাব, ক্রীড়া ক্লাব, রক্তদান ক্লাবসহ নানা স্বীকৃত সংগঠন থাকে, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় সম্পৃক্ত থেকে জ্ঞান অর্জন করে এবং দক্ষতা বৃদ্ধি করে। বিশ্বজুড়ে এটাই এখনো পর্যন্ত আধুনিক ধারণা। কারণ এ ধরনের এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি শিক্ষার্থীদের কেবল একাডেমিকভাবেই নয়, সামাজিক ও পেশাগতভাবে দক্ষ, দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এতসব স্বীকৃত সংগঠনের মধ্যে ছাত্র সংসদ একটি সংগঠন মাত্র। কিন্তু আমাদের দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র না থাকার কারণে, ছাত্র সংসদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য সংগঠনের মতো হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় সীমা অতিক্রম করে এটি জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এমনকি একটি ছাত্র সংসদের নেতা নির্বাচন এখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিশাল আয়োজন এবং নির্বাচনের ওপর মিডিয়ার অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়ার কারণে আমাদের মাঝে এ ধারণা তৈরি হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো হবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় এবং মূল কাজই হলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা।
এখন প্রশ্ন হলো আমাদের দেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে, বিশেষ করে ডাকসুকে কেন্দ্র করে এ সংস্কৃতি কেন গড়ে উঠেছে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে কিছু বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। প্রথমত, ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে যে মিথ (ভ্রান্ত ধারণা) প্রচলিত আছে তা আলোচনা করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি ছাত্র সংসদ রাজনীতিকেন্দ্রিক আমাদের যে আচরণ তা যে ৫৪ বছর বয়সী, রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থাকা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র গণ-আন্দোলন করে ফ্যাসিস্ট রেজিমকে উপড়ে ফেলে দিয়েছে তার সঙ্গেও যে বেমানান তাও আলোচনা করা দরকার।
দীর্ঘ বহু বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে (ডাকসু) ‘মিনি পার্লামেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। প্রচারের ফলে এ ধারণা এতটাই গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে যে অনেকেই এ মিথ যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বাস করে আসছে। ডাকসুকে মিনি পার্লামেন্ট বলার ক্ষেত্রে এর সাংবিধানিক ক্ষমতা, কার্যপরিধি ও দায়িত্ব বিবেচনায় না নিয়ে যারা এখানে রাজনীতি করে তাদের রাজনৈতিক-দলীয় প্রভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অসীম স্পর্ধাকেই বিবেচনায় নেয়া হয়।
ছাত্র সংসদের ক্ষমতা কতটুকু? গার্মেন্টসে লেবার ইউনিয়ন যেমন কর্মীদের স্বার্থ দেখে এবং মালিককে কর্মীবান্ধব পলিসি নিতে চাপ সৃষ্টি করে, তেমনি ছাত্রছাত্রীদের অধিকার রক্ষায় এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করতে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ। এর বেশি কিছু না। কিন্তু জাতীয় সংসদ যেমন জনগণের প্রকৃত দরবার হল হয়ে ওঠেনি, তেমনি ডাকসুও ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেনি। এ মিলের কারণে একে মিনি পার্লামেন্ট বলা যেতেও পারে।
আরেকটি বড় মিথ হলো ছাত্র সংসদ জাতীয় নেতা তৈরি করে। তবে হ্যাঁ, ছাত্র সংসদ থেকে কেউ কেউ জাতীয় রাজনীতিতে আসে। কিন্তু যেভাবে প্রচার করা হয় যে ছাত্র সংসদ থেকে বড় বড় নেতা বেরিয়ে আসছে জাতীয় রাজনীতিতে, এটা অতিরঞ্জিত।
বাংলাদেশে একশর বেশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হয় এবং পাস করে বেরিয়ে যায়। এ ইউনিভার্সিটিগুলোয় ডাকসুর মতো ছাত্র সংসদ নেই। তাহলে কি ছাত্র সংসদ না থাকার কারণে এ বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী নেতৃত্ব গুণ অর্জন করতে পারেনি? ২০২৪ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভূমিকা প্রমাণ করে তারা সোকল্ড ছাত্র সংসদ ছাড়াই রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল। ২০২৪ সালেও তো ডাকসু ছিল না। ডাকসু ছাড়াই তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বৈরাচার উৎখাত করেছে। এমনকি ১৯৯০ সালের পর ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন হয়নি। তাহলে এ দীর্ঘ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কি কোনো নেতা তৈরি হয়নি? বরং যারা ডাকসুর নেতা ছিল, জাতীয় রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা মানুষ যেভাবে প্রত্যাশা করে তার চেয়ে অনেক নিম্নমানের।
তাহলে ছাত্র সংসদ নিয়ে মিথ তৈরি করার এবং এ চলমান উত্তেজনার কারণ কী? রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের দখলে রাখতে চায়, এটা সবাই জানে। এই একই কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদেরও সংগঠন আছে, যা সাদা দল ও নীল দলে বিভক্ত। এ শিক্ষক নেতাদের গুগল স্কলারে আইডি নেই, থাকলেও রিসার্চ নেই, বছরের পর বছর কোনো আর্টিকেল পাবলিশ না করে শুধু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গোলামি করে টিকে আছে সদর্পে। ক্যাম্পাস দখলের রাজনীতি পুরনো। কোনো দলই লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করবে না। যদিও সাধারণ মানুষ, এমনকি ছাত্রছাত্রীরাও ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি চায় না। লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে মানুষের যেই অবস্থান সেই অবস্থানকে ভুল প্রমাণিত করে, ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি চালু রাখাই সব মিথ এবং চলমান উন্মাদনার মূল কারণ। এটা কীভাবে হবে? ছাত্র সংসদ নির্বাচনের হাইপ তুলে, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের গুরুত্ব অতিরঞ্জিতভাবে প্রচার করে, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মধ্যেই প্রকৃত গণতন্ত্র নিহিত—এ মিথ্যা প্রচার করে, ক্যাম্পাস দখলে রাখতে না পারলে দলীয় আদর্শের মৃত্যু ঘটবে—এ কথা বলে ব্রেইন ওয়াশের মাধ্যমে ছাত্রদের আদর্শগত দাঙ্গার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। যখন এ আদর্শগত দাঙ্গায় রক্তপাত হবে, তখনই ছাত্ররাজনীতিকে ‘মুরব্বিদের’ অধীনে রাখার জন্য রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পুরনো বয়ান আরো শক্তিশালীভাবে হাজির হবে। ছাত্ররাজনীতি ‘মুরব্বিদের’ অধীনে থাকার আরো দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত তৈরি হবে।
এই ছাত্র ও শিক্ষক সংগঠনের লেজুড়বৃত্তির কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে পারেনি। বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার স্টেট না, উন্নতও না, তার পরও এ রাষ্ট্র প্রায় বিনা পয়সায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা দেয়। এ অনুন্নত দেশই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্রের পেছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করে। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেনের মতো উন্নত দেশও বাংলাদেশের মতো বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে বিনা পয়সায় শিক্ষা প্রদান করে না।
কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ছাত্রসংগঠনের নির্বাচনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে কি আদৌ কোনো পড়ালেখা হচ্ছে? ক্লাস হচ্ছে? ক্লাস হলেও যারা এ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গ সম্পৃক্ত তারা কি ক্লাসে যায়? এমনকি কোনো কোনো নেতা-নেত্রী এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। শুধু তাই নয়, তারা এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে চার বছর মেয়াদি অনার্স কমপ্লিট করতে পারেনি। যারা নিজেদের শিক্ষা কার্যক্রমকে শেষ করতে পারল না, রাষ্ট্রের পয়সা তছরুপ করল, তারাই হবে আমাদের জাতীয় নেতা। কী দুর্ভাগ্য আমাদের।
আমাদের মনে হতে পারে ছাত্র সংসদ নির্বাচন মনে হয় অন্যান্য দেশে এভাবেই হয়। খুব বেশি টপ ইউনিভার্সিটির এক্সামপল দেব না। পশ্চিমা দেশের উদাহরণ দিলে অনেকে বলে যে এরা তো অনেক উন্নত। তাই তাদের উদাহরণও বাদ। র্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে থাকা ইউনিভার্সিটি অব রুয়ান্ডা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা ইউনিভার্সিটি অব লাগস, নাইজেরিয়া, আমাদের উদাহরণ হতে পারে। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গিয়ে সবার পক্ষে জানা সম্ভব নয় যে কীভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। তাই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট, স্থানীয় ইউটিউব এবং ওই দেশের জাতীয় মিডিয়া ঘাঁটাঘাঁটি করে আপনি দেখতে পাবেন ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নিউজ নেই, আয়োজন নেই, আমাদের মতো উন্মাদনা নেই, আদর্শগত দাঙ্গা নেই।
তাই গণতন্ত্র চর্চার নামে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরে, ব্যাপক মিডিয়া কাভারেজ দিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আদর্শগত দাঙ্গার যে আয়োজন আমরা শুরু করেছি তাতে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি আরো সহিংস হয়ে উঠবে, লেজুড়বৃত্তি ছাড়া ছাত্ররাজনীতির যে আবেদন সমাজে ছিল তাও থাকবে না এবং বিশ্ববিদ্যালয় হবে দাঙ্গার কুরুক্ষেত্র।
ড. মো. ফরিদ তালুকদার: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ম্যাকনিস স্টেট ইউনিভার্সিটি, লুইজিয়ানা, যুক্তরাষ্ট্র


