সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন শিক্ষক, প্রফেসর নীলিমা আখতার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়েছেন, যা ইতোমধ্যেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে তিনি সরকার, এনসিপি, জামায়াত এবং বিশেষভাবে নোবেলজয়ী প্রফেসর ইউনূসের সমালোচনা করেছেন। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা করা একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের নাগরিক অধিকার এবং অনেক ক্ষেত্রে নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু তার বক্তব্যের একটি বিশেষ অংশ গভীর উদ্বেগ ও চিন্তার জন্ম দিয়েছে। তিনি লিখেছেন : ‘…গত বছর থেকে আজ পর্যন্ত যত লাশ, যত ক্ষত, যত ব্রেইনওয়াশÑতার জন্য দায়ী জামায়াত, নাহিদগং এবং ড. ইউনূস।’
এই বক্তব্যে অন্তত দুটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা নিহিত রয়েছে
প্রথমত, তিনি গত এক বছরে (বিশেষত জুলাই-অগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে) কেন্দ্র করে যত প্রাণহানি ঘটেছে, তার দায় পুরোপুরি চাপিয়েছেন জামায়াত, এনসিপি ও ড. ইউনূসের ওপর।
দ্বিতীয়ত, যারা এই গণজাগরণে অংশ নিয়েছেন, বিশেষ করে যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, নিপীড়িত হয়েছেনÑতাদের তিনি অভিহিত করেছেন ‘ব্রেইনওয়াশড’ হিসেবে।
এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিকভাবে একপেশে নয়, তা বিপজ্জনকও। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যখন এমন দায়িত্বহীন এবং বিভ্রান্তিমূলক ভাষা ব্যবহার করেন, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত মতামত নয়, তা হয়ে ওঠে মতাদর্শগত দমননীতির অংশ, যা বুদ্ধিজীবীদের নৈতিক দায়িত্ববোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ইতিহাসের পক্ষ থেকে কিছু প্রশ্ন
আমি প্রফেসর নীলিমাকে কোনো রাজনৈতিক ট্যাগে আবদ্ধ করতে চাই না। কারণ রাজনৈতিক পরিচয় তুলে এনে আর্গুমেন্টকে হালকা করে ফেলা বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা। বরং আমি তার বক্তব্যের নির্যাস ধরে কিছু প্রশ্ন তুলতে চাই, যা হয়তো তার বিবেককে জাগ্রত করবে এবং বৃহত্তর পরিসরে আমাদের সমাজে বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে সহায়তা করবে।
প্রথম প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন না যে বিগত ১৬ বছর বাংলাদেশে একটি ফ্যাসিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল?
যদি আপনার উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে কিছু ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিতে চাইÑ
২০০৯, ২০১৪, ২০১৮ তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় নির্বাচন;
৫০ লাখেরও বেশি মানুষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা;
বিডিআর হত্যা মামলা, শাপলা চত্বরে গণহত্যা, মোদিবিরোধী বিক্ষোভে নির্বিচার গুলি;
ক্যাম্পাসগুলোয় রাষ্ট্রপন্থি ছাত্র সংগঠনের টর্চার সেল, আবরার-ফাহাদ-বিশ্বজিৎদের হত্যাকাণ্ড;
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, গোপন নির্যাতনকেন্দ্র ‘আয়নাঘর’;
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় ভয়াবহ দমন এবং রাষ্ট্রীয় করপোরেট লুটপাটের মহোৎসব।
এই বাস্তবতা অস্বীকার করার অর্থ মানুষের কষ্ট, গণতন্ত্রের বিপর্যয় ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করা। আপনি যদি স্বীকার করেন যে শাসন ছিল ফ্যাসিবাদী, তাহলে আপনার দায়িত্ব ছিল সেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। আপনি কি তা নিয়েছেন?
বুদ্ধিজীবীর কাজ কি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, নাকি তাকে ঢেকে দেওয়া?
একজন শিক্ষক, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শুধু পাঠদানের যন্ত্র নন,তিনি একজন চিন্তাবিদ, মূল্যবোধ নির্মাতা এবং গণতান্ত্রিক সমাজের রক্ষক। তার দায়িত্ব জনগণের পাশে দাঁড়ানো, নিপীড়িতদের ভাষা হওয়া, ক্ষমতার উৎপীড়নকে প্রশ্ন করা।
কিন্তু প্রফেসর নীলিমা, আপনি যেভাবে গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষকে ‘ব্রেইনওয়াশড’ বলেছেন, তা শুধু অজ্ঞতার পরিচয় নয়, তা রাষ্ট্রীয় বয়ানকে বুদ্ধিবৃত্তিক পোশাক পরানোর একধরনের কৌশলও বটে।
তাহলে প্রশ্ন উঠবেই
যারা জেল-জুলুম সয়ে, হাতে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড তোলে, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, সাংবাদিক, নির্মাণশ্রমিকÑসবাই একসঙ্গে রাজপথে নামলেন, তারা কি ‘বিকারগ্রস্ত’?
যদি জনগণের ন্যায়সংগত বিদ্রোহ হয় ‘ব্রেইনওয়াশড’, তাহলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নামে যা ঘটেছিল, সেটিও কি একদল ‘উন্মাদ’ মানুষের কর্মকাণ্ড ছিল?
ইতিহাসে কি শুধু সেই পক্ষই ন্যায্য, যারা রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি থাকে?
এই প্রশ্নগুলো আপাতত কঠিন, কিন্তু দরকারি। কারণ আমরা এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ইতিহাস লিখিত হচ্ছে রক্ত আর অস্বস্তির ভাষায়। সেখানে শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক সবার একটাই দায়িত্ব। সত্যের পক্ষে থাকা, যেখানেই তা থাকুক না কেন।
লাশের রাজনীতি বনাম প্রতিরোধের নৈতিকতা
আপনি আপনার পোস্টে ‘লাশের রাজনীতি’ নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। আমরাও লাশের রাজনীতিকে ঘৃণা করি। কিন্তু যখন রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকদের হত্যা করে, তখন সেই লাশ শুধু দুঃখের নয়, তা প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।
যারা বুক চিতিয়ে সেই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তারাই এক অর্থে আমাদের সময়ের নায়কেরূপে ইতিহাসে স্মরণীয় হবেন। আপনি তাদের অবমূল্যায়ন করে কাকে শক্তিশালী করছেন রাষ্ট্রকে, নাকি মানুষকে?
শুধু ড. ইউনূস কিংবা এনসিপি-জামায়াতকে দোষ দিয়ে আপনি একটি জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সরলীকরণ করছেন। একবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এতটা ছাঁকাভরা হতে পারে না। আপনিও জানেন, গুজব, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব আর দলীয় প্রোপাগান্ডা দিয়ে একটি জাতির বিবেক জাগ্রত হয় না।
শেষ কথা : ইতিহাস একদিন বিচার করবে
প্রফেসর নীলিমা, আপনি শিক্ষক। আপনি জানেন একজন শিক্ষক নিজের সময়কে না চিনলে, নিজের ছাত্রদের কষ্ট না বুঝলে, নিজের জাতির দুঃখ না শুনলে—তার জ্ঞান অর্থহীন হয়ে পড়ে।
আজ যখন আমরা ছোট শিশুদের লাশ কাঁধে নিয়ে হাঁটি, যখন আমরা গণতন্ত্রের জন্য রাজপথে রক্ত দিই, তখন আপনার লেখনী কীভাবে সেই মানুষের বিরুদ্ধে যায়, সেটি ইতিহাস একদিন আপনাকে জিজ্ঞেস করবেই। তখন আপনার জবাব প্রস্তুত থাকবে তো?
আপনার মতো অনেকেই আছেন, যারা আজও নীরব, কেউ কেউ রাষ্ট্রের ভাষায় কথা বলছেন। কিন্তু আমরা যারা ইতিহাসের সঠিক পাশে থাকতে চাই, তারা জানিÑভয় নয়, বিবেকই পথ দেখায়।
লেখক : গবেষক ও শিক্ষক, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিএইচডি গবেষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট, যুক্তরাষ্ট্র
২৬শে আগস্ট, দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত


