
বাংলাদেশে রেমিট্যান্স নিয়ে আলোচনা প্রায়ই একটি পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু হয় কত বিলিয়ন ডলার এলো, কত শতাংশ বাড়ল। কিন্তু এ সংখ্যাগুলো নীতিনির্ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ রেমিট্যান্স শুধু অর্থের প্রবাহ নয়; এটি একটি জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যা প্রবাসী শ্রমিক, তাদের পরিবার এবং রাষ্ট্র এ তিন স্তরের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক অস্থিরতা বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক শ্রমবাজারের সংকোচন-বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করছে। কারণ, দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের বড় অংশই আসে সেই অঞ্চলগুলো থেকে, যেখানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। এ বাস্তবতায় রেমিট্যান্সকে শুধু অর্থনৈতিক সূচক হিসাবে না দেখে, একটি ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু অপরিহার্য নির্ভরতার কাঠামো হিসাবে বোঝা জরুরি।
রেমিট্যান্স : অর্থের প্রবাহ নাকি সম্পর্কের ধারাবাহিকতা?
রেমিট্যান্সকে যদি কেবল ‘বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ’ হিসাবে দেখা হয়, তাহলে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হারিয়ে যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত Remittance as Belonging: Global Migration, Transnationalism, and the Quest for Home বইটি আমাদের এ সরলীকৃত ধারণা থেকে বের করে আনে। এই গবেষণা-গ্রন্থে আমি দেখিয়েছি রেমিট্যান্স মূলত একটি সম্পর্কভিত্তিক প্রক্রিয়া, যেখানে অর্থ পাঠানো মানে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং ‘বাড়ি’র সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা ।
একজন প্রবাসী শ্রমিক যখন মাস শেষে অর্থ পাঠান, তখন তিনি শুধু একটি লেনদেন সম্পন্ন করেন না; তিনি তার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করেন, তার পরিচয়কে আবার নিশ্চিত করেন, এবং দূরত্ব সত্ত্বেও তার অন্তর্ভুক্তি বজায় রাখেন। এ প্রক্রিয়াটি এতটাই গভীরভাবে সামাজিক যে এটি প্রায়ই অর্থনৈতিক যুক্তির সীমা অতিক্রম করে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রবাসীরা নিজের কষ্টের কথা পরিবারকে জানায় না, বরং একটি সফলতার গল্প তুলে ধরে। কারণ তারা জানে, তাদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভর করছে পরিবারের দৈনন্দিন জীবন। এ বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় রেমিট্যান্স একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হলেও, এটি একইসঙ্গে একটি নৈতিক ও আবেগগত সিদ্ধান্ত।
নৈতিক অর্থনীতি ও রেমিট্যান্সের সামাজিক কাঠামো
রেমিট্যান্স বোঝার জন্য ‘নৈতিক অর্থনীতি’ ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অর্থনৈতিক আচরণ শুধু ব্যক্তিগত লাভক্ষতির হিসাবের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না; বরং সামাজিক নিয়ম, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে প্রভাবিত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, একজন প্রবাসী ছেলের কাছ থেকে তার পরিবারের প্রত্যাশা থাকে সে নিয়মিত অর্থ পাঠাবে, পরিবারের দায়িত্ব নেবে, এবং সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখবে। এ প্রত্যাশা এতটাই শক্তিশালী যে অনেক সময় এটি ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধেও কাজ করে।
আমার গবেষণা দেখায়, রেমিট্যান্সের পেছনে থাকা প্রেরণা ‘স্বার্থ’ ও ‘পরার্থপরতা’-এ দুইয়ের সরল বিভাজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে একজন অভিবাসী একই সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পরিবারের চাহিদা, এবং সামাজিক স্বীকৃতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও রেমিট্যান্সের আন্তঃসম্পর্ক
বাংলাদেশে রেমিট্যান্সের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। একটি গ্রামে যদি কয়েকজন প্রবাসী থাকে, তাহলে সেই গ্রামের অর্থনৈতিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হয়। নতুন বাড়ি তৈরি হয়, কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ে, দোকানপাট গড়ে ওঠে, এবং শিক্ষার হার বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এ ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি একটি নির্ভরতার বাস্তবতাও তৈরি হয়। অনেক পরিবার তাদের আয়ের প্রধান উৎস হিসাবে রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। ফলে যদি কোনো কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যায় যেমন, চাকরি হারানো, যুদ্ধ, বা অর্থনৈতিক মন্দা তাহলে সেই পরিবারগুলো তীব্র সংকটে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে রেমিট্যান্সকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ স্থিতিশীলতা’ হিসাবে দেখা যায় যা একদিকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেয়, অন্যদিকে বাহ্যিক ঝুঁকির ওপর নির্ভরশীল।
বেকারত্ব, দক্ষতা ও অভিবাসনের নীতিগত সংযোগ
বাংলাদেশের যুবসমাজের একটি বড় অংশ এখন পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না। এ বাস্তবতায় অভিবাসন একটি স্বাভাবিক বিকল্প হিসাবে সামনে আসে। কিন্তু এই অভিবাসন যদি পরিকল্পিত না হয়, তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। দক্ষতা এখানে একটি মূল বিষয়। দক্ষ শ্রমিকরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বেশি মূল্য পায়, ভালো মজুরি অর্জন করে, এবং বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে সক্ষম হয়। বিপরীতে, অদক্ষ শ্রমিকরা কম মজুরি পায় এবং প্রায়ই অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়। অতএব, রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে শুধু শ্রমিক পাঠানোই যথেষ্ট নয়; তাদের দক্ষ করে তোলাও জরুরি।
বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ : অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের সরকার এ বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রণোদনা-এসব উদ্যোগ ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ হয়েছে, যা লেনদেনের খরচ কমিয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।
একই সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণের জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে আস্থা তৈরি করতে সহায়তা করছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতাও রয়ে গেছে। অভিবাসন ব্যয়ের উচ্চতা, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, এবং গন্তব্য দেশে শ্রমিকদের অধিকারহীনতা এখনও বড় সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধান না হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ টেকসই হবে না।
নীতিনির্ধারণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন
রেমিট্যান্সকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে নীতিনির্ধারণে একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার। এটি শুধু অর্থনৈতিক নীতি নয়; এটি একটি সামাজিক নীতি। প্রথমত, প্রবাসী শ্রমিকদের শুধু ‘ডলার আনার মাধ্যম’ হিসাবে না দেখে, তাদেরকে মানবসম্পদ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রবাসী পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা বাহ্যিক ধাক্কা সামাল দিতে পারে। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে ডায়াসপোরার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য একটি সুসংহত কৌশল প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রেমিট্যান্সকে একটি ‘সম্পর্কের অর্থনীতি’ হিসাবে বোঝা। কারণ যতদিন সেই সম্পর্ক থাকবে, ততদিন রেমিট্যান্স থাকবে।
রেমিট্যান্সের মানবিক অর্থ
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তি, কিন্তু এর প্রকৃত শক্তি অর্থের পরিমাণে নয়; বরং এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে কতটা গভীরভাবে যুক্ত, তার ওপর নির্ভর করে। একজন প্রবাসী যখন অর্থ পাঠান, তখন তিনি শুধু একটি অর্থনৈতিক লেনদেন করেন না; তিনি একটি পরিবারকে টিকিয়ে রাখেন, একটি সমাজকে সচল রাখেন, এবং একটি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেন।
অতএব, রেমিট্যান্স নিয়ে নীতিনির্ধারণ করতে হলে আমাদের সংখ্যার বাইরে গিয়ে মানুষের গল্প, সম্পর্ক এবং অন্তর্ভুক্তির এই জটিল বাস্তবতাকে বুঝতে হবে। তাহলেই রেমিট্যান্স সত্যিকার অর্থে টেকসই উন্নয়নের একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
ড. হাসান মাহমুদ : সহযোগী অধ্যাপক, নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কাতার
০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম, দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত।